খবর

দুই অংকের প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি খাতে প্রাধান্য: সালমান এফ রহমান


গতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিদ্যুতের সর্বোত্তম ব্যবহার নিয়ে রোববার ঢাকার ওয়েস্টিন হোটেলে এফবিসিসিআই আয়োজিত অনুষ্ঠানে একথা বলেন তিনি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও ছিলেন এই সভায়।

সরকারের এই দুই নীতি নির্ধারক শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ পেতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে শিল্প কারখানা স্থাপনের পরামর্শ দেন।

সালমান এফ রহমান বলেন, “জিডিপি, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, মাথাপিছু আয়সহ অর্থনীতির সূচকগুলোতে আজকের যে উন্নতি তা ১০ বছর আগে কল্পনাও করা যেত না। এটা সম্ভব হয়েছে কেবল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃঢ় নেতৃত্বের কারণে।
“প্রধানমন্ত্রী চাচ্ছেন নতুন সরকারের এই মেয়াদের মধ্যেই যেন আমাদের প্রবৃদ্ধি দুই অংকে পৌঁছে যায়। বেসরকারি খাতকে প্রাধান্য দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন করতে চাচ্ছেন তিনি।”

সে কারণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগোচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।

“বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও সেই মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে,” বলেন তিনি।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ এর ঘরে, সেই প্রবৃদ্ধি এই দশ বছরে বেড়ে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ হয়েছে।
যত্রতত্র কারখানা স্থাপনর ফলে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহের অসুবিধার কথা তুলে ধরে পরিকল্পিতভাবে কারখানা স্থাপনের পরামর্শ দেন সালমান এফ রহমান। পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে অন্যান্য ক্ষেত্রেও অচিরেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেন তিনি।

সালমান রহমান বলেন, “ইজি অব ডুয়িং বিজনেস সূচকে সংখ্যায় এগিয়ে আসার চেয়ে ব্যবসার পরিবেশের উন্নতির জন্য সহায়ক কিছু ক্রাইটেরিয়া নিয়ে কাজ করতে হবে। কিছু সমস্যা আছে যেগুলো আসলেও দ্রুত সমাধানের সুযোগ রয়েছে। সেই ব্যাপারগুলোর দিকে নজর দিতে চাচ্ছে সরকার।”

ব্যবসা পরিস্থিতির উন্নয়নে কর্মকর্তাদের সেবা ও সহযোগিতার মানসিকতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান বলেন, “সরকারি কর্মকর্তাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। তাদের মাথায় রাখতে হবে ব্যবসায়ীরা যখন কোনো বিষয় নিয়ে উপরের পর্যায়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে তখন ধরেই নেওয়া যায় যে, তারা নিচের দিকে অসহযোগিতার কারণে ব্যর্থ হয়ে উপরে এসেছে। এই ক্ষেত্রে তাদের সমস্যার সমাধানটাও খুব দ্রুত দিতে হবে।”

উদ্যোক্তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে প্রয়োজনে মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে একটি ‘প্রবলেম সলভিং ডেস্ক’ চালু করার কথা বলেন সালমান এফ রহমান।
বিদ্যুতে ‘অভাবনীয়’ সাফল্য তুলে ধরে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব আহমেদ কায়কাউস বলেন, ২০০৮ সালের মোট উৎপাদন ৪ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট থেকে বর্তমানে ২০ হাজার ৮৮৫ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা।

দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫৬ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে আসছে বলেও জানান তিনি।

ডিপিডিসি, আরইবি, স্রেডা, পিডিবিসহ বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন দপ্তর ও বিভাগের কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে নিজেদের মতামত জানান।

এফবিসিসিআই সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, “শতভাগ বিদ্যুতের টার্গেট ২০২১ সালের মধ্যে পূরণ হলেও বিদ্যুৎ সেবার মানোন্নয়নের ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কায় আছে। এটা না থাকায় শিল্প উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
“বিদ্যুতের আসা-যাওয়া ও নিম্ন ভোল্টেজ শিল্প উৎপাদন ব্যহত করে। বছর বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের লাভ-লোকসান হিসাব করতে পারেন না। এই সমস্যাগুলো এখনও দূর করা যায়নি।”

ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে হতাশা জানিয়ে তিনি বলেন, “এ দিক বিবেচনা করলে বলতে হয়, প্রাইভেট সেক্টর সংগ্রাম করে সামনে এগোচ্ছে। ব্যবসার সূচকে বাংলাদেশ আফগানিস্তানের চেয়েও পিছিয়ে থাকা খুবই দুঃখজনক। বিদ্যুৎ নিয়ে অনেক সুখবরের মধ্যে এখনও রাজধানীর বাইরের এলাকাগুলোতে লোডশেডিং থেকে গেছে।

“ঢাকার বাইরে এখনও প্রতিদিন ২-১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এখনও লাইন স্থানান্তর করতে গিয়ে অনেক দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। বিদ্যুৎ আসা যাওয়ার কারণে ডায়িং, সিরামিকসহ বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এসব সমস্যার সমাধান সাপেক্ষে এই দেশে আরও বড় বড় বিনিয়োগ অপেক্ষা করছে।”

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেতে যত্রতত্র শিল্প-কারখানা স্থাপনের পরিবর্তে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে শিল্পস্থাপনের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়ার পরমর্শ দেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

তিনি বলেন, “কোথাও সুলভ মূল্যে জমি পেলে সেখানে শিল্প স্থাপন করে ফেলা এবং পরে গ্যাস-বিদ্যুতের চাহিদা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সব স্থানে একই হারে একই সুবিধাসহ গ্যাস-বিদ্যুৎ দেওয়া যায় না। তবে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গ্যাস-বিদ্যুৎসহ যাবতীয় ইউটিলিটি সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে সরকার।
“পরিকল্পিত কারখানা করলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ পাবেন। অন্যথায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সম্ভব নাও হতে পারে।”

বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, কল-কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের যে সঙ্কট ছিল তা অনেকখানি কেটে গেছে। নিজস্ব ২৭০০ এমএমসিএফডি গ্যাসের সঙ্গে এখন আমদানি করা এলএনজি যুক্ত হয়েছে প্রায় ৫০০ এমএমসিএফডি। বিদ্যুতের উৎপদান ব্যয় ভোক্তাদের নাগালে রাখতে জ্বালানি বৈচিত্র্যের দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। ক্রসবর্ডার বিদ্যুৎ সঞ্চালনকেও একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতে প্রতিনিয়ত নতুন নুতন প্রযুক্তি যুক্ত হচ্ছে উল্লেখ প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আগামী ৫০ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে সরকার কাজ করছে। গভীর সমুদ্রে এলএনজি টার্মিনাল, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন, ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের জন্য তেল আমদানি, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভূ-গর্ভস্ত সঞ্চালন লাইন নির্মাণ এসব প্রকল্প অগ্রাধিকারে রয়েছে।”